সংগীতের মানোন্নয়নে লিরিক হাউজ এর ভুমিকা: গুণীজনদের ভাবনা

সংগীত যেকোনো দেশের সংস্কৃতির মুখপাত্র। বাংলা/বাঙালি সংস্কৃতিতে ইসলামী সংগীতের প্রভাব ক্রমেই বিস্তার লাভ করছে। ইসলামী সংগীতের মানোন্নয়ন, ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণে লিরিক হাউজ এর ভুমিকা ও কর্মপন্থা/উদ্যোগ কতটা জরুরী সে বিষয়ে আলোকপাত করেছেন গুণিজন সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিবর্গ।

বুধবার ৯সেপ্টেম্বর লিরিক হাউজ আনুষ্ঠানিক 'ঘোষণপত্র পত্র প্রকাশ' অনুষ্ঠানে ফেসবুক লাইভে আলোচনা করেন বিশিষ্ট গীতিকার, কবি ও লেখক সাইফ সিরাজ, ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক ও সম্পাদক জিয়াউল আশরাফ, কথাসাহিত্যিক, লেখক ও উদ্যোক্তা রোকন রাইয়ান, গীতিকার সায়ীদ উসমান, জনপ্রিয় শিল্পী ও সুরকার মুহাম্মদ বদরুজ্জামান, তরুণ সুরকার এইচ আহমেদ। লাইভ আলোচনার সংক্ষিপ্ত অনুলিখন তুলে ধরা হলো।

আলোচনায় জিয়াউল আশরাফ বলেন, আমরা যারা ইসলামী সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করি সবার জন্য এই ক্ষেত্রটা বিশাল। এই বিশাল দিগন্তে কাজ করা একটা জিনিস আর কাজের ক্ষেত্র খুঁজে বের করাটা আরেকটা জিনিস। লিরিক হাউজ খুঁজে বের করার এই কাজটা করেছে। কয়েকদিন আগেও লিরিক নিয়ে যে এরকম কিছু হতে পারে, লিরিক হাউজ হতে পারে সেটা আমার মাথায় ছিলো না। আসলে এ অঙ্গনে যোগ্য মানুষের অভাব। আগে আমরা সাহিত্যসভা করতাম। সাহিত্য সংস্কৃতির নানান দিক নিয়ে আলোচনা করতাম, শুনতাম। সেখান থেকে শিখে শিখে যোগ্য কর্মী উঠে আসতো। এখন সেটা হয়ে না বললেই চলে। আমরা যদি নতুনদের পরিচর্যা করতে পারতাম তাহলে কোয়ালিটি সম্পন্ন কর্মী উঠে আসতো। লিরিক হাউজ হয়েছে। যে উদ্যোগ লিরিক হাউজ নিয়েছে তা খুবই চমৎকার। সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। সমস্ত শিল্পীগোষ্ঠী সহ যারা শিল্পী সবাই এ উদ্যোগে খুশি হবে। ইনশাআল্লাহ এর দ্বারা আমরা উপকৃত হবো। শিল্পীরাও উপকৃত হবে। আমরা যদি শুদ্ধতার চর্চা করতে না পারি তাহলে অপসংস্কৃতি রোধ করা যাবে না। মিছিল, মিটিং-রাজনীতির মাধ্যমে অপসংস্কৃতি প্রতিরোধ করা সম্ভব না।

সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা একটা জাতিকে পরিবর্তন করতে পারে উল্লেখ্য করে আল্লামা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ এর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, 'যেদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি, কৃষ্টি কালচার যতো শক্তিশালী হবে সেদেশের সীমান্ত ততো শক্তিশালী হবে'।

তিনি বলেন, আমাদের সাহিত্য চর্চা যতো শক্তিশালী হবে আমরা ততো সমৃদ্ধ হবো। লিরিক হাউজ যে উদ্যোগ কর্মপন্থা নীতিমালা সে আলোকে সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা সমৃদ্ধ হবে আশা করি।

সাইফ সিরাজ বলেন, লিরিক হাউজ নিয়ে প্রথম যখন আমার সাথে শাহনূর শাহীন এর সাথে কথা হয়। তখন এটাকে তারুণ্যের আবেগ মনে হয়েছিলো। আমরা যেটা তারুণ্যে করে থাকি। এটা মনে হওয়ার কারণ হলো এরকম অনেক আবেগ সামনে এগোয় না। যে কারণে বলেছিলাম লিরিক হাউজ এগিয়ে যেতে যতটুকু সম্ভব হয় পাশে থাকার চেষ্টা করবো। করোনাকালে যতগুলো জুম মিটিংয়ের আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম দুইটা কারণে। প্রথম নেটওয়ার্ক প্রবলেম, দ্বিতীয়ত নিজেকে সামনে আনার অনীহা। কিন্তু লিরিক হাউজ এর কর্ণধারদের লেগে থাকার কারণে মনে হলো লিরিক হাউজ একটা ভালো জায়গায় যাবে।

আমি একটা সময় মাহের জাইন, পাকিস্তানের ফাহাদ শাহদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করতাম। তাদের সাথে কথা বলে জানতাম ওদের একটা লিরিক গান হয়ে ওঠার জন্য বিশাল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আমাদের দেশে যেমন হরেদরে সস্তায় লিরিক লিরিক পাওয়া সেরকম ওদের হয় না।

মাহের জাইন আমাকে বলেছিল, একটা লিরিক সুরকারের হাতে যাওয়ার আগে চারজন লোক লিরিকটা যাচাই বাছাই করে। লিরিকে শৈল্পিক মান, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ, মানবিক দিক বা দেশীয় স্বার্থ সংঘাত হয় কিনা এর সেটা সুর উপযোগী কিনা যাচাই করা হয়।

আমাদেরকে আরো স্মার্ট হতে হবে। সংগীতের মানোন্নয়ন করতে হবে। লিরিকগুলো আরো শৈল্পিক হতে হবে। শুধুমাত্র ধর্মীয় সংগীত বা মাদরাসা ছাত্র/ধর্মানুরাগী অডিয়েন্স ছাপিয়ে যেতে হবে। তবে ইসলামী সংগীতের যে রুহানিয়াত সেটা ঠিক রাখতে হবে।

তিনি বলেন, ইসলামী সংগীতের বিশাল বাজার। আমরা যদি এটাকে ঠিকঠাক পরিচালনা করতে না পারি তাহলে অন্যরা দখল করবে। আমরা যখন সুরকার, গীতিকার ও অন্যান্যদের বঞ্চিত করবো তখন অন্যরা আমাদের ইন্ডাস্ট্রি দখল করে নিবে। তারা বিশাল বাজেট নিয়ে এসে লিরিক-সুর পেমেন্ট করবে, তাদের অভিজ্ঞ টিম থাকবে, কাজগুলো সুন্দর হবে। তখন আমরা যে বাজার তৈরী করেছি সেটা অন্যরা ভোগ করবে। সুতরাং আমাদের এটার পরিচর্যা করা দরকার। যাদের পুঁজি আছে, এমন অনেকেই আসার চেষ্টা করছেন।

আমি এরকম লিরিকিস্ট পেয়েছি যার ২৫-৩০টি গান রিলিজ হয়েছে কিন্তু কোনো পেমেন্ট পায়নি। এটা পরিবর্তন হোক। আমি তাকে বলেছি আপনি বলুন অন্তত ৫০ টাকা দিন। না দেয়ার অভ্যাস পরিবর্তন হোক। দেয়া-নেয়া যদি না থাকে এই ইন্ডাস্ট্রি হারিয়ে যাবে। একজন গীতিকার পরিশ্রম করে একটা গান লিখবে- শিল্পী মঞ্চে গেয়ে উপার্জন করবে, ইউটিউব থেকে আয় করবে, স্টুডিও আয় করবে অথচ আমি কিছু পাবো না এই ভাবনা থেকে অনেকে লেখা বন্ধ করে দেন। আমার বিশ্বাস জিয়াউল আশরাফ ভাই কোনো ফিডব্যাক না পেয়েই গান লিখছেন না এখন। আবার অনেক হাইব্রিড লেখক আছে যারা নাকি টাকা দেয় নিজের গান করানোর জন্য।

ইদানিংকালে ইসলামী সংগীত রুহানিয়াতের বাইরে গিয়ে (সুর লিরিক নিয়ে নয়) লাইফ স্টাইল দিয়ে যে প্রতিযোগিতা হচ্ছে আমি আশা করি লিরিক হাউজ এই জায়গায় কাজ করবে।

কেননা, এরকম হলে ভালো কাস্টিউম হবে, গল্প হবে কিন্তু ভালো সংগীত হবে না। রুহানিয়াত চিন্তার বাহিরে গিয়ে যদি বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, সিনেমাটিক, বা লাইফস্টাইল দিয়ে প্রতিযোগিতা করি তাহলে ভালো গল্প হবে, ভিডিও হবে কিন্তু ভালো সংগীত হবে না। এগুলো দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি টিকে থাকবে না। ইসলামী সংগীত হারিয়ে যাবে। ইসলামী সংগীতে হৃদয় আদ্র হবে। প্রশান্তি আসবে। সেটা না হয়ে যদি সেলিব্রিটিজম প্রেম-ভালোবাসা হয় তাহলে আল্লাহর গজব আসবে। ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংস হয়ে যাবে।

লিরিক হাউজ এই জায়গায় কাজ করবে। সংগীতের মূল ভিত্তি রুহানিয়াত আধ্মাতিকতা বজায় রেখে ইসলামী সংগীতের উত্তরণ ঘটবে। লিরিক হাউজের মাধ্যমে আমরা সমৃদ্ধ ইন্ডাস্ট্রি পাবো।

লিরিক হাউজ এর অবদান মানুষ স্মরণ করবে সে আশা করছি।

সবশেষে তিনি বলেন, ছোট বড় বিবেচনায় না নিয়ে সবার সাথে কাজ করতে হবে। কারো ব্যাপারে নেগেটিভ কথা বার্তা না বলে সবার সাথে সম্পর্ক রেখে কাজ করতে হবে। অনেকে উপহাস করবে, নিন্দা করবে, অবহেলা করবে সেসব মাথায় নিয়ে ধৈর্যের সাথে এগোতে হবে

রোকন রাইয়ান বলেন, এটা একটা চমৎকার উদ্যোগ। করোনাকালে আলেমদের নানান স্টার্টআপ দেখতে পাচ্ছি। এরকম একটা উদ্যোগের আসলেই দরকার ছিলো। আশা করি তরুণ আলেমদের এই উদ্যোগগুলো বড় একটা জায়গায় পৌঁছবে। এরজন্য আমাদের যথাসাধ্য সহযোগিতা করতে হবে। লিরিক হাউজ সময়ের বাস্তবতা। একটা একটা খালি জায়গা ছিলো। লিরিকারদের ব্যাসিকেলি পরিচয় বা ডাটাবেস আমাদের কাছে নেই। কতজন লিরিকার আছেন জরিপ নাই।

সাইফ সিরাজ ভাই চমৎকার সংগীত লিখেন, সায়ীদ উসমান ভাইও লিখেন। কিন্তু কয়টা গান রিলিজ হয়েছে সেটার জরিপ নাই। আমিও দুটো গান লিখেছিলাম কিন্তু সেগুলো আমার কাছেও নাই। সেটা হারিয়ে গেছে। লিরিক হাউজ যে কাজটা করবে এটা আমাদের জন্য চমৎকার কাজ হবে। একটা সংরক্ষণগার থাকলে প্রেরণা থেকেও আমরা লিখতে পারবো। এটাকে কীভাবে নান্দনিক করা করা যায় কর্তৃপক্ষ ভাববে ইনশাআল্লাহ। লিরিক হাউজের উদ্যোগ এগিয়ে যাক। আমাদের একটা সমৃদ্ধ ডাটাবেইজ থাকুক।

সায়ীদ উসমান, লিরিক হাউজ কর্তৃপক্ষকে বিশেভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তারা যে স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করেছে সে স্বপ্ন পূরণ হোক। সুন্দর অগ্রযাত্রা সুন্দর হোক। আমাদের একটা সেতুবন্ধন থাকা দরকার। এটা আমাদের অঙ্গনে ছিলো না। কাউকে না কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে কাজ করতে হবে। সেই জায়গা থেকে শাহনূর ও রায়হান ফারুকের এই উদ্যোগে ধন্যবাদ জানাই।

সায়ীদ উসমান বলেন, আমাদের লিরিকগুলো সম্পাদনা হয় না। আশা করি লিরিক হাউজ সেই দায়িত্বটা নিবে। তাহলে অনেক ভালো কাজ হবে। অনেক শিক্ষিত মানুষ গান শুনেন। শব্দের ভুল ব্যবহার, বাক্যের ভুল প্রয়োগ শুনলে তারা লজ্জা পান, আমরাও লজ্জা পাই। তারা মনে করেন এ অঙ্গনে শিক্ষিত কেউ হয়তো লিরিক লিখেন না। এতে আমাদের লজ্জা হয়। এই জায়গায় কাজ করা দরকার।

কলরব এর জনপ্রিয় তারকা, হলিটিউন এর সিইও মুহাম্মদ বদরুজামান বলেন, আজাদ ভাই থাকতে জিয়া ভাইর লিরিক পেয়েছিলাম। যেগুলো সারাদেশে ব্যাপী আলোড়ন তুলেছিলো। এখন পাচ্ছি না। কলরব এই জায়গায় চেষ্টা করে। আসলে সংগীত চর্চা আবেগের বিষয়। বাস্তবতা হলো প্রফেশনাল চিন্তা করে অংশগ্রহণ করার লোক এ অঙ্গনে খুব কম। আমি আশা করি লিরিক হাউজের মাধ্যমে আমরা যারা লিখি, চর্চা করি সবাই মিলে ভালো একটা জায়গা তৈরী হবে। আশা রাখছি, সবাই মিলে সুন্দর ইন্ডাস্ট্রি হবে। এটা আমাদের স্বপ্ন। নানা কারণে আমরা এগোতে পারছি না। একটা জায়গায় গেলে আমাদের মাঝে একটা খামখেয়ালীপনা তৈরী হয়। দ্রুত বড় শিল্পী হবো। ভালো না হলেও বেশি গজল করে পরিচিত হবো এরকম খামখেয়ালিপনা হয়। এই জায়গায় কাজ করতে হবে। একজনের মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রি হয় না। সবাই মিলে হবে। শুভকামনা লিরিক হাউজের জন্য।

সুরকার এইচ আহমেদ উপস্থিত অতিথি এবং শ্রোতাদের সংগীত গেয়ে শোনান। লিরিক হাউজ এর উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এটা চমৎকার একটি আইডিয়া। এখানে কাজ করার দরকার ছিলো।

কমেন্টস

নিবন্ধন / প্রবেশ করুন

পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন!

অ্যাকাউন্ট নেই ? এখন নিবন্ধন করুন

ফেইসবুক

ইউটিউব

আর্কাইভ